মাসিক পত্রিকা

بسم اللہ الرحمن الرحیم

অবতরনিকা

সমুদয় গুণগান সেই মহান সত্তার যিনি উত্তর জাাহনের সৃষ্টিকর্তা, লাখো কোটি দরূদ ও সালাম সেই শেষ্ঠ মানবের প্রতি যিনি। নবী ও রাসুলগণের শিরোমনি। বর্তমানযুগে মানুষের অজ্ঞতা ও স্বল্প ধার্মিকতার কারনে যে ঠাট্টা-বিদ্রুপ ছাড়িয়ে পড়েছে। এই বিষয়ের ভয়াবহতা সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করার জন্য ও তা থেকে বেঁচে থাকার জন্য আমি এই স্বল্প কয়েকটি পাতা লেখেছি। আমি আল্লাহর তায়ালা কাছে কামনা করি, যেন তিনি তাতে বরকত দেন এবং তা দ্বারা সকলকে উপকৃত করেন। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা ও দোয়া কবুলকারী। আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (স) এ, তার পরিবারবর্গ এবং সমস্ত সাহাবায়ে কেরামের উপর শান্তি ও রহমত বর্ষন করেন।

ভূমিকা
اسهزاء এর পরিচয়ঃ ইবনে মানযূর (রহ) বলেন الاستهزاء শব্দটি باب فتح অর্থ হল! ভেঙ্গে ফেলা যেমন বলা হয়, “লোকটি ভেঙ্গে গিয়েছে” অর্থাৎ মারা গিয়েছে।
“আমি তাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছি” সে আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছি “সে আমাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করেছে, আমি তাকে নিয়ে বিদ্রুপ করেছি। এসগুলোই হল استهزاء، استهزاء এর অপর নাম سخریة তথা استهزاء এমন একটি শব্দ, যেটা নি¤েœাক্ত বিদ্রোপ করা বিষয়গুলোকে অন্তর্ভূক্ত করে:
ক) বিদ্রুপ করা, খ) ত্রুটি খোঁজা গ) পরিহাস করা ঘ) হেয় প্রতিপন্ন করা
“ঠাট্টা বিদ্রুপ করা’ একটি নিন্দনীয় চরিত্র, যা দ্বীনের শত্রু ইহুদি, নাসারা ও মুনাফিকদের স্বভাব। তাদের অভিপ্রায় হলো ইসলাাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা, এবং মুমীনদের বিরুদ্ধে তাদের লু-হাওয়া ছাড়িয়ে দেয়ার সুযোগ খোজা। অতঃপর এই বিপদ জনক মহামারি শুকনো খড়ে আগুন ছাড়িয়ে পড়ার মতই ছড়িয়ে পড়ল। এবং ঠাট্টা বিদ্রুপের নিষিদ্ধতাকে ভুলে যাওয়া কিছু মুসলমান তা গ্রহণ করে নিল। ফলে ঠাট্টা-বিদ্রুপ নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতি তাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে প্রশ্নের সম্মুখীন করবে।
আল্লাহ পাক আমাদেরকে এবং তাদেরকে সুপথ দান করুন।


রসিকতা তিন প্রকার:
(১) অনুমোদিত এবং প্রশংসাযোগ্য রসিকতা : আর সেটি হচ্ছে, যা ভাল উদ্দেশ্যে, সৎ নিয়তে এবং শরয়ী নিয়ম নীতি অবলম্বন করে সম্পাদন করা হয়। যেমন মাতা-পিতার সাথে আদবের সহিত রসিকতা করা অথবা স্ত্রী, সন্তানদের সাথে, অনুরূপ বন্ধু-বান্ধবদের সাথে তাদের অন্তরে আনন্দ-খুশির উপস্থিতির জন্য রসিকতা করা। এগুলির দ্বারা রসিকতাকারীর পুণ্য লাভ হয়।
এই প্রকার রসিকতার অনুমোদনের প্রমাণ নবী করীম সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সহাবীদের আমলের মধ্যে পাওয়া যায়। যেমন :
ক) যাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা. এর হাদীসে এসেছে: যখন যাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) বিবাহ করলেন নবীজী সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে প্রশ্ন করলেন: হে যাবের তুমি কি বিবাহ করেছ? আমি বললাম: হ্যাঁ। রাসূল সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: কুমারী না বিধবা? আমি বললাম: বিধবা। রাসূলুল্লাহ বললেন: তুমি কুমারী মেয়ে বিবাহ করলে না কেন? কুমারী মেয়েকে বিবাহ করলে সে তোমার সাথে হাসি-তামাশা করত, আর তুমিও তার সাথে হাসি-তামাশা করতে পারতে। (মুসলিমঃ ৩৫০১)
খ) আয়েশা রা. এর হাদীসে এসেছে: কোন এক সফরে তিনি নবী সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে ছিলেন। আয়েশা রা. বলেন : আমি রাসূলের সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রবৃত্ব হলাম এবং রাসূল সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে পিছনে ফেলে দিলাম। অত:পর যখন আমার শরীর মোটা হয়ে গেল আবার প্রতিযোগিতা করলাম রাসূল বিজয়ী হলেন। তখন বললেন: এই বিজয় ঐ বিজয়ের পরিবর্তে (শোধ)। (আবু দাউদঃ২২১৪(
গ) আনাস রা. থেকে বর্ণিত এক হাদিসে আছে নবী সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার তাকে এ বলে সম্বোধন করেছিলেন: ((হে দুই কান বিশিষ্ট ব্যক্তি)) হাদীসের একজন বর্ণনাকারী আবু উসামা বলেন:অর্থাৎ রাসূল তার সাথে রসিকতা করছিলেন। (তিরমিজিঃ ৩৫(
ঘ) আনাস রা. থেকে বর্ণিতঃ কোন এক ব্যক্তি রাসূলুল¬হ সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট একটি (ভারবাহী জন্তু) বাহন চাইলেন, রাসূল সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমি তোমাকে একটি উটের বাচ্চার উপর চড়িয়ে দেব। সে বলল: হে আল্লা¬র রাসূল আমি উটের বাচ্চা দিয়ে কি করব? রাসূল সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: উটতো উটের বাচ্চা ছাড়া আর কিছু জন্ম দেয় না। (বুখারিঃ ১৯১৪(
ঙ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একবার হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) কে বললেন, “তুমি একটা গাধা”। একথা বলার কারণ হলো, হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) প্রতিদিন সকালে ফলের দোকানে গিয়ে ভালো ভালো ফলগুলো নবীর জন্য নিয়ে আসতেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, আপনার জন্যই বাজার থেকে উত্তম ফলগুলো নিয়ে আসি। এভাবে যখন একমাস পূর্ণ হলো দোকানদার নবীর দরবারে একটি বিলের কাগজ পাঠিয়ে দিলো। সেটা দেখে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আবদুল্লাহকে লক্ষ্য করে বললেন, ”তুমি না ফলগুলো আমাকে হাদিয়া দিয়েছ, তাহলে এখন আবার বিল কিসের?” এবার আবদুল্লাহ (রাঃ) উত্তর দেন, আমি বাজারে গিয়ে সর্বোত্তম ফলগুলো দেখি আর মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম মানুষ খুঁজি, অবশেষে আপনাকেই পাই; তাই আপনার জন্য ফলগুলো কেনার সিদ্ধান্ত করি। কিন্তু আমার কাছে টাকা না থাকায় আপনার নামে লিখে রাখতে বলেছি। একথা শোনামাত্র রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হাসি মুখে বিল পরিশোধ করে দেন এবং আব্দুল্লাহকে লক্ষ্য করে স্বস্নেহে বললেন, “তুমি একটা গাধা”। একথা শুনে আবদুল্লাহ খুব আনন্দিত হয়ে আজীবন নিজের জন্য এটাকে অত্যন্ত গৌরবের বিষয় মনে করতেন। পরে অন্যান্যদেরকে জানিয়ে দেন যে, “আজ থেকে আমার নাম ‘আবদুল্লাহ হিমার।’ (হিমার অর্থ গাধা।) কারণ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) -এর পবিত্র মুখ থেকে এ নামটি বের হয়েছে আমার জন্য”। পরবর্তীতে এ নামেই তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেন।

(২) মুবাহ রসিকতা : ঐ রসিকতা যার কোন সঠিক উদ্দেশ্য নেই, ভাল নিয়তও নেই, কিন্তু শরীয়তের নির্ধারিত গন্ডি থেকে বের হতে হয় না এবং নিয়মও ভঙ্গ করা হয়না। পাশাপাশি অতিরিক্ত পরিমাণেও করে না যে অভ্যাসে পরিণত হযয়ে যাবে । এমন রসিকতা প্রশংসাযোগ্যও নয় আবার নিন্দাযোগ্যও নয়। সুতরাং এর ভিতর কোন পুণ্য নেই। কারণ পুন্য পাওয়ার যে নীতিমালা অর্থাৎ সঠিক উদ্দেশ্য এবং সৎ নিয়ত তা এখানে পাওয়া যায়নি অনুরূপভাবে কোন গুনাহও হবেনা কারণ শরীয়তের বিরুদ্ধাচারণ করা হয়নি বা কোন নীতি ভাঙ্গা হয়নি।

রসিকতার কতিপয় নীতিমালা ও আদব :
প্রথমত : রসিকতা করার ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলোর প্রতি গুরত্ব দিতে হবে :
১। ভাল নিয়ত অর্থাৎ রসিকতা করার সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মনে মনে এমন ধারণা পোষন করবে যে সে আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন এমন একটি ভাল কাজ করছে। যেমন রসিকতার মাধ্যমে নিজ ভাই, স্ত্রী, পিতা বা এমন কারো অন্তরে খুশি-আনন্দ প্রবেশ করিয়ে তাদের কর্ম চঞ্চল করে তোলা। অথবা উক্ত তামাশা করার মাধ্যমে কাউকে একটি ভাল কাজের নিকটবর্তী করে দেয়া।অথবা নিজ আত্মাকে ভালকাজের জন্য শক্তি সঞ্চয়ের লক্ষ্যে প্রফুল্ল করা। বা এরূপ যে কোন ভাল নিয়ত পোষন করা। আর এ মহান মূলনীতির প্রমাণ হল রাসূল সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী ঃ إنما الأعمال بالنيات সমস্ত কাজের ফলাফল নিয়তে উপর ভিত্তি করে নিরোপিত হয়।
২। সত্যকে অত্যাবশ্যকীয় করে নেয়া অর্থাৎ রসিকতা করার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সত্য ও বাস্তবধর্মী রসিকতা করবে এবং মিথ্যা পরিহার করবে।
আবু হুরাইরা রা. বলেন: লোকেরা বলল: হে আল্লাহর রাসূল আপনি কি আমাদের সাথে রসিকতা করছেন? নবীজী সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: আমি সত্য ছাড়া বলি না।(তিরমিজি ঃ ১৯১৩(
৩। রসিকতা করার ক্ষেত্রে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সম্মান বোধ থাকতে হবে, মানুষকে তার যোগ্য মর্যাদা দিতে হবে এবং প্রতিপক্ষের মন-মানসিকতা বুঝতে হবে। সকল মানুষ ঠাট্টা-রসিকতা পছন্দ করে না।
দ্বিতীয়ত: রসিকতার সময় যে সমস্ত বিষয় থেকে বেচে থাকতে হবে।
১। মিথ্যা, ঠাট্টার ছলে হোক আর উদ্দেশ্যমূলক ভাবেই হোক মিথ্যা সর্বাবস্থায়ই হারাম এবং শরীয়তের দৃষ্টিকোন থেকে খুবই নিকৃষ্ট কাজ। মানুষকে হাসানোর জন্য যে মিথ্যা বলে তার প্রতি বিশেষ শাস্তির কথা এসেছে। আর এটা এই জন্য যে এটি খুবই বিপদজনক, সাথীদেরকে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি এর ভিতর খুব সহজেই জড়িয়ে পড়া যায়, এবং এর মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করা যায়।
রাসূল সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
ধ্বংস ঐ ব্যক্তির জন্য যে মানুষকে হাসানোর জন্য কথা বলে অতঃপর মিথ্যা বলে, তার ধ্বংস অনিবার্য, তার ধ্বংস অনিবার্য। (তিরমিজি ঃ ২২৩৭(
শরীয়ত মিথ্যা বলার এ কুঅভ্যাসকে শুধু এখানে নিষিদ্ধ করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং রাসূল সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঠাট্টা-রসিকতার মত বিষয়েও এটি পরিত্যাগ করতে সকলকে দারুন ভাবে উদ্বুদ্ধ করেছেন। বলেছেন:
আমি জান্নাতের মধ্যবর্তী স্থানে একটি বিশেষ ঘরের জিম্মাদারী গ্রহন করছি ঐ ব্যক্তির জন্যে যে সর্বোতভাবে মিথ্যা পরিহার করেছে এমনকি রসিকতার মাঝেও। (আবু দাউদঃ ৪১৬৭)
২। হাসি-রসিকতার ক্ষেত্রে বাড়া-বাড়ি এবং পরিমাণে এত অধিক করা যে মজলিসটিই হাসি-তামাশার মজলিসে রূপানিিরত হয়ে যায় এবং মূল লক্ষ-উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয় বিষয়াদি চাপা পড়ে যায়। আর এটি ব্যক্তির পরিচয় ও বৈশিষ্টে পরিনত হয়। এরূপ পর্যায়ের মজা-রসিকতা নিন্দনীয়। কেননা এতে সময় নষ্ট হয়। ব্যক্তিত্বের প্রভাব নষ্ট হয় যায়, বৈশিষ্ট্য পূর্ণ ইসলামী ব্যক্তিত্ব শেষ হয়ে যায়, অবশ্যই ইহা মিথ্যায় পতিত করে। অন্যকে ছোট করা হয়, ছোটরা বড়দের উপর সাহসী হয়ে উঠে। অন্তর মরে যায় এবং মুসলমান যে ধরনের বাস্তব ও উপকারী গুনাগুন দ্বারা অলংকৃত থাকার কথা তা তার থেকে দূরে সরে যায়।
৩। বেগানা নারীদের সাথে ঠাট্টা করা। কেননা এটা ফিতনা ও অশ্লীলতায় পড়ার কারণ এবং অন্তর হারামের দিকে ধাবিত করে।
৪। অন্যের ক্ষতি সাধন করা, কষ্ট দেওয়া বা অধিকার হরণ করা, অথবা এমন আঘাত করা যা সীমা লঙ্ঘন করে অথবা এমন জিনিস দ্বারা ঠাট্টা করা যার দ্বারা ক্ষতি হতে পারে যেমন পাথর বা অস্ত্র এ ধরনের ঠাট্টা হিংসা বিদ্বেষ তৈরি করে বরং কখনও ঝগড়ার পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ঠাট্টাকে তখন আর ঠাট্টা মনে করা হয়না বাস্তব মনে করা হয় আর ভালোবাসা পরিবর্তিত হয়ে যায় হিংসায়। পছন্দ মোড় নেয় অপছন্দের দিকে । আল্লাহ বলেনঃ
وَقُلْ لِعِبَادِي يَقُولُوا الَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْزَغُ بَيْنَهُمْ
আমার বান্দাদেরকে বলে দিন তারা যেন যা উত্তম এমন কথাই বলে। শয়তান তাদের মাঝে সংঘর্ষ বাধায়। (সুরা আল ইসরাঃ৫৩(
৫। শরীয়তের বিষযয়দি নিয়ে রসিকতা করা। শরীয়তের বিষযয়েরসিকতা করাকে উপহাস ও বিদ্রুপ হিসাবে ধরা হয় যা মূলত: কুফরী এবং এগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে রক্ষা করুন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ
وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآَيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ. لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ.
আর যদি তুমি তাদের কাছে জিজ্ঞেস কর তবে তারা বলবে আমরাতো কথার কথা বলছিলাম এবং কৌতুক করছিলাম। আপনি বলুন : তোমরা কি আল্লাহর সাথে তার হুকুম আহকামের সাথে এবং তার রাসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে, ছলনা করো না, তোমরা যে কাফের হয়ে গেছ, ঈমান প্রকাশ করার পর। (সুরা তাওবাহঃ৬৫-৬৬(
(৩) নিন্দাযোগ্য রসিকতা : অর্থাৎ যে রসিকতা মন্দ উদ্দেশ্যে এবং অসৎ নিয়তে অথবা শরীয়তের নির্ধারিত রীতি ভঙ্গ করে সম্পাদন করা হয় । এর উদাহরণ: যেমন মিথ্যা মি¯্রতি রসিকতা, অথবা অন্যকে কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে কৃত রসিকতা যাকে استهزاء বলা হয়।
استهزاء বিভিন্ন ধরনের হতে পারে।
(১) আল্লাহ তায়ালা, তার নিদর্শন এবং তার রাসূলকে নিয়ে ঠাট্টা করা: যে ব্যক্তি এই প্রকার ঠাট্টা বিদ্রুপে লিপ্ত হবে সে কাফের। এই কথাটি নিন্মোক্ত আয়াতে প্রমাণিত-
قل اباللہ وایاته ورسله کنتم تستهزءون لا تعتزروا قد کفرتم بعد ایمانکم۔
অর্থ: (হে নবী!) আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহ পাক, তার নিদর্শন এবং তার রাসূল (স) কে নিয়ে উপহাস করছ? তোমরা অজুহাত পেশ করনা তোমরা তো ঈমান আনার পর কুফুরিতে লিপ্ত হয়েছ।
(সূরা তাওবা, আয়াত নং- ৬৫-৬৬)
চাই সে ইচ্ছাকৃতভাবে এরূপ ঠাট্টা-বিদ্রুপ করুক কিংবা অনিচ্ছায় করুক। চাই সে হাসি-ঠাট্টা করে করুক বা ঐকান্তিকভাবে করুক, সর্ব অবস্থায় সে কাফের হয়ে যাবে।
উপরোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ সম্পর্কে আল্লামা ইবনে জারীর তবরী (রহ.) তার তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, আল্লামা ইবনে আবী হাতেম হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) হতে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেন, আব্দুল্লাহ ইবনে উমরা (রাঃ) বলেন তাবুক যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে একদা এক মজলিসে জনৈক ব্যক্তি বলল, আমরা এই লোকদের মত ভিতু, মিথ্যুক এবং বুঝদিল আর কাউকে দেখিনি, অতঃপর মজলিসের মধ্যে অপর এক জনৈক ব্যক্তি বলল, তুমি মিথ্যা বলেছ, বরং তুমি মুনাফেক। অবশ্যই আমি রাসূল (স) কে এই বিষয়ে জানাব। অতঃপর এই সংবাদ নবী করিম (স) এর নিকট পৌঁছলে উপরোক্ত আয়াত নাযিল হয়।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) বলেন, অতঃপর আমি নবী করিম (স) এর উটের কোমর বন্ধের সাথে ঐ মুনাফিককে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখেছি। তার কাধে পাথর তুলে দেয়া হল, সে বলতে লাগল, হে আল্লাহর রাসূল! নিশ্চয় আমরা কৌতুক ও গল্পগোজব করছিলাম।
তখন নবী করীম (স) বললেন,
اباللہ وایاته ورسله کنتم تستهزءون لا تعتزروا قد کفرتم بعد ایمانکم۔
অর্থ: তোমারা কি আল্লাহ তায়ালা তার নিদর্শন সমূহ এবং তার রাসূলকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করছ? অজুহাত পেশ করনা। তোমরা তো ঈমান আনার পর পূনরায় কুফুরিতে লিপ্ত হয়েছে।

কাব বিন আশরাফ হত্যার ঘটনা যা থেকে বর্তমান মুসলিম উম্মাহ শিক্ষা নিতে পারে।
কাব বিন আশরাফ ছিলো একজন ইহুদী নেতা এবং খুবই প্রভাব সৃষ্টিকারী জ্বালাময়ী কবি। যখন বদরে মুসলমানদের বিজয়ের সংবাদ মদীনায় পৌঁছালো, তখন কাব বিন আশরাফ সেই সংবাদ শুনে বলল, "যদি এই সংবাদ সত্যি হয়ে থাকে তাহলে আমাদের জন্য মাটির নিচে থাকাই তার উপরে থাকার চেয়ে উত্তম। অর্থাৎ মৃত্যুই আমাদের জন্য শ্রেয়। কুরাইশদের পরাজয়ের পর আর বেঁচে থেকে কি লাভ!"
সে মুশরিকদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে কবিতা রচনা এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো শুরু করলো। এরপর সে মক্কায় তার কবিতা ছড়িয়ে দিলো। কুরাইশদের প্রতি সহমর্মিতা পোষণ করে যুদ্ধে তাদের ক্ষয়-ক্ষতিতে দুঃখ প্রকাশ করলো। শুধু এ পর্যন্তই নয়, এর থেকেও আরো বেড়ে গিয়ে সে এবার করে তার কবিতার মাধ্যমে মুসলিম নারীদেরকেও কটাক্ষ করা শুরু করলো। তাই আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
من لى بكعب إبن الأشرف فإنه قد أذى الله و رسوله
অর্থ: "কে এমন আছে? যে কাব ইবনে আশরাফের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে! কেননা সে আল্লাহ এবং তার রাসূলকে কষ্ট দিচ্ছে।"
রাসূলের এই আহ্বান শুনে মুহাম্মাদ বিন মাসলামাহ রা. যিনি আউস গোত্রের একজন বিশিষ্ট আনসার সাহাবী ছিলেন তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আদেশ করুন আমি আছি। আপনি কি এটা চাচ্ছেন যে আমি তাকে হত্যা করি?"

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, "হ্যাঁ।"
রাসূলুল্লাহ সা. এর পক্ষ থেকে নির্দেশনা পেয়ে এবার মুহাম্মাদ বিন মাসলামাহ রা. এবার অঙ্গীকার করলেন। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে কথা দিলেন যে তিনি নিজে কাব ইবনে আশরাফকে হত্যা করবেন।
বাসায় গিয়ে বিষয়টি নিয়ে মুহাম্মাদ বিন মাসলামাহ রা. চিন্তা করতে লাগলেন। ব্যাপারটা তার কাছে যেন কঠিন মনে হলো। কারণ কাব ইবনে আশরাফ তার সমর্থক দিয়ে পরিবেষ্টিত একটি দূর্গে থাকতেন যা ছিলো ইহুদী বসতির মধ্যে। তাই এই দুর্ভেদ্য দূর্গের ভেতর গিয়ে তাকে হত্যা করাটা ছিলো অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ।
তিনি ভাবতে লাগলেন কিন্তু কোন কুলকিনারা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। বিষয়টি তাঁর নাওয়া খাওয়া বন্ধ করে দিল। জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য সামান্য কিছু আহার্যের বাইরে তিনি পানাহার করতে পারছিলেন না। এভাবে প্রায় তিনদিন কেটে গেলো।
এই খবর আল্লাহর রাসূলের নিকট পৌঁছলে তিনি তাঁকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, "তোমার কি হয়েছে হে মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ? এটা কি সত্য যে তুমি পানাহার করা বন্ধ করে দিয়েছো?"
মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ রা. বললেন, "জি হ্যাঁ।"
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, "কেন?"
তিনি বললেন, "আমি আপনার কাছে একটি অঙ্গীকার করেছি আর সেই অঙ্গীকার পূরণ করা নিয়েই আমি চিন্তিত।"
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন,
إنما عليك الجهد অর্থ: "তোমার কাজ তো কেবল চেষ্টা করা।" (সামগ্রিক ফলাফলের দায়িত্ব মহান আল্লাহর উপর ছেড়ে দাও)
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আসুন আমরা এ বিষয়টি নিয়ে একটু ভাবি। আমরা একটি মুহূর্তের জন্য থামি এবং হৃদয়েরর দৃষ্টি দিয়ে বিষয়টি অনুধাবনের চেষ্টা করি যেমন কি অধিক পরিমাণ আনুগত্য ও উদ্দীপনার এই সাহাবীর (আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা তার উপর সন্তুষ্ট হোন) মধ্যে ছিল। তিনি পরিস্থিতি নিয়ে এত বেশী চিন্তিত ছিলেন যে, তিনি নাওয়া-খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তিনি স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারছিলেন না। কারণ এটি ছিল তার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তিনি অঙ্গীকার করেছেন, তার পর তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন যে তিনি কি সেই অঙ্গীকার পালন করতে পারবেন কিনা।
যখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে সাহস দিলেন, আশ্বস্ত করে বললেন, "তুমি তোমার চেষ্টা কর, আর বাকীটা আল্লাহর উপর ছেড়ে দাও", তখনিই তিনি আশ্বস্ত হলেন এবং পুনরায় স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে শুরু করলেন।
আজকে রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অবমাননার বিষয়টি নিয়ে আপনি কতটুকু চিন্তিত? আমরা কতটুকু উদ্বিগ্ন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সম্মানের, ইসলামের মর্যাদা এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর কিতাবের বিষয়ে? আমরা বিষয়গুলোকে কতটা গুরুত্ব সহকারে নেই?
মুহাম্মাদ বিন মাসলামাহ রা. একাধারে তিন দিন তিন রাত পর্যন্ত তার প্রতশ্রুতির ব্যাপারে চিন্তা করছিলেন। আজ আমরা মুসলিমদের মাঝে পুনরায় এই সাহাবীর মনোভাবের পুনরাবৃত্তি চাই।
মুহাম্মাদ বিন মাসলামাহ রা. তার দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি একটি পরিকল্পনা করলেন। এজন্য রাসূলের কাছে একটি বিষয়ের অনুমতি চাইলেন। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে এসে তিনি বললেন,
"হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমাকে তাহলে আপনার বিরুদ্ধে কথা বলার অনুমতি দিতে হবে।" [পরিকল্পনার বিষয় হলো যে, আমাকে আপনার ব্যাপারে নেতিবাচক কথা বলতে হবে] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, "এ ব্যাপারে তোমাকে অনুমতি দেয়া হলো।"
এবার মুহাম্মাদ বিন মাসলামাহ রা. আনসারদের মধ্যকার আওস গোত্র থেকে অল্প কয়েকজনকে নিয়ে ছোট একটি জামাত গঠন করলেন। যাদের মধ্যে একজন ছিলেন আবূ নায়লা। এটি কথিত আছে যে আবূ নায়লা ছিলেন কাব বিন আশরাফের সৎভাই। তাঁরা কা'ব ইবন আশরাফের জন্য একটি ফাঁদ পাতলেন।
মুহাম্মাদ বিন মাসলামা রা. তার ক্ষুদ্র দলটি নিয়ে কাব ইবন আশরাফের সাথে সাক্ষাত করতে গেলেন। কা'ব এর সাথে দেখা হলে পরিকল্পনা অনুযায়ী আল্লাহর রাসূলের দিকে ইঙ্গিত করে কাবকে বললেন,
"এই লোকটি আমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে একটি পরীক্ষা ও একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে একটি দুর্যোগ এবং তার জন্যই পূরো আরব আমাদের শত্রু হয়ে গেছে এবং আমাদের সাথে লড়াই করছে।"
কাব বললো, "আমি তো এটি জানতাম। তাই তো তোমাদের আগেই বলেছি এবং সামনে তোমরা আরও বিপদে পরবে, খারাপ সময় দেখবে।"
মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ বললেন, "আমরা অপেক্ষা করতে চাই এবং দেখতে চাই এর শেষ কিভাবে হয়। তিনি এখন কা'বের সাথে একটি ভাব তৈরী করার চেষ্টা করতে লাগলেন। তিনি বললেন,
"হ্যাঁ, কাব, লোকটার জন্য আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটছে, আর্থিকভাবে একটু সমস্যায় পরে গেছি। তোমার কাছ থেকে আমরা কিছু ধার নিতে চাই, যার বিনিময়ে প্রয়োজনে তোমার নিকট কিছু জামানাতও রাখতে রাজি আছি।"
কা'ব বলল, "ঠিক আছে, তাহলে তোমাদের সন্তানদের রেখে যাও।"
তাঁরা বললো, "তোমার কাছে আমাদের সন্তানদের রেখে গেলে তাদের বাকী জীবন এই খোঁটা শুনতে হবে যে, সামান্য ঋণের জন্য তাদের পিতা তাদেরকে বন্ধক রেখেছিল। এটি তাদের সারা জীবনের জন্য একটি লজ্জাস্কর বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।"
কা'ব বললো, "তাহলে তোমাদের স্ত্রীদের রেখে যাও।"
তারা বললো, "তোমার মতো সুদর্শন পুরুষের নিকট আমরা কিভাবে আমাদের স্ত্রীদের রেখে যাবো? তার চেয়ে বরং আমরা আমাদের অস্ত্রগুলো তোমার নিকট বন্ধক রেখে যেতে পারি।"
সে বলল, "ঠিক আছে, এটি হতে পারে।"
মুহাম্মাদ বিন মাসলামাহ কা'বের জন্য এভাবে ফাঁদ পাতলেন। যাতে তার কাছে পরের বার অস্ত্র আনতে গেলে সে সন্দেহ না করে। তিনি পরবর্তী সাক্ষাতের জন্য রাতের একটি মুহূর্তকে নির্ধারণ করলেন এবং নির্ধারিত সেই সময়ে গভীর রাতের উপযুক্ত এবং সঠিক সময়ে তার কাছে ফিরে এলেন। ঘরের বাইরে থেকে এবার তিনি কা'বকে ডাক দিলেন।
কাবের স্ত্রী সেই আওয়াজ শুনে বলল, "আমি এই ডাকের মধ্যে রক্তের গন্ধ পাচ্ছি।"
কা'ব বলল, চিন্তা করো না, "এটি হচ্ছে আমার বন্ধু মাসলামাহ এবং আমার ভাই আবু নায়লা।"
এতে বুঝা যায় যে, তাদের মাঝে জাহেলিয়াতের সময় থেকেই সুসম্পর্ক ছিলো, বন্ধুত্ব ছিলো।
অতঃপর সে নিচে গেলো মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ রা. ও তার সাথীদের সাথে দেখা করতে। ইতোমধ্যে তারা একটি সংকেত ঠিক করে নিয়েছিলেন। মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ তাদের বললেন, "আমি কৌশলে ওর মাথা ধরবো। যখন তোমরা আমাকে ওর মাথা ধরতে দেখবে, তখনই তালোয়ার দিয়ে তাকে শেষ করে দেবে।" এটাই ছিল তাদের সংকেত।
কাব আসতেই তারা তাকে বললেন, "আজকের রাতটি শি'ব আল আযুজ গিয়ে গল্প করে কাটিয়ে দিলে কেমন হয়?"
সে বলল, "বেশ।"
এভাবে তারা তাকে তার দূর্গ থেকে বের করে শি'ব আল আযুজ নামক স্থানে নিয়ে যেতে সক্ষম হলো।
সেখানে পৌঁছানোর পর, মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ কাবকে বললেন, "বাহ! তোমার থেকে তো অনেক সুন্দর ঘ্রান আসছে! আমি কি এর ঘ্রান নিতে পারি?" এটা বলে তিনি কা'বের চুলের দিকে ইঙ্গিত করলেন। চুলে তেলজাতীয় কোন সুগন্ধী লাগানো ছিল।
সে বলল, "হ্যাঁ, নাও।"
মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ তার হাত দিয়ে কাবের মাথাটাকে টেনে নিলেন এবং শুকে দেখলেন। তিনি বললেন, "এটাতো দারুণ। (এটি ছিল দেখার জন্য একটি পরীক্ষা।)"
তিনি বললেন, "তুমি কি আরেকবার আমাকে এর ঘ্রান নিতে দেবে?"
সে বলল, "হ্যাঁ, নাও।"
এবার তিনি তার মাথার চুল গুলোকে ভালোভাবে ধরলেন এবং তালোয়ার দিয়ে তাকে আঘাত করতে থাকলেন। সাথে আসা আওসের সাহাবীরাও এগিয়ে এলেন। সে সাহায্যের জন্য চিৎকার করে উঠল। তাৎক্ষণিকভাবে সবগুলো দূর্গতে আলো জ্বলে ওঠল। মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ বললেন,"আমার মনে পড়ল যে আমার কাছে একটি ছুরি আছে। তাই আমি সেটা বের করে তা দিয়ে তার তলপেটে আঘাত করলাম। একেবারে নিম্নাংশের হাড় পর্যন্ত সেটি গেঁথে দিলাম এবং কাজ শেষ করে দ্রুত সে স্থান ত্যাগ করলাম।"
মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ এবং আওসের লোকেরা এভাবেই সেই পাপাচারী শয়তানকে দেখে নিয়েছিলেন, যে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তিরস্কার করত।
ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ. তার الصارم المسلول على شاتم الرسول বা "রাসূলকে অভিশাপকারীর বিরুদ্ধে উদ্যত তালোয়ার" নামক কিতাবে এই ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছেন। এই ঘটনা উল্লেখ করার পর তিনি কিছু বিষয় উল্লেখ করেন যা আমরা আলোচনা করব।
প্রথমেই তিনি সীরাতের একজন বিজ্ঞ শায়খ আল ওয়াকিদী রহ. এর বর্ণনা আনেন। আল ওয়াকিদী এই ঘটনার পরিণতি সম্পর্কে বলেন,
"এটি একটি খুবই শক্তিশালী এবং বিশেষ অভিযান ছিল এবং এর ফলাফলও ছিল ব্যাপক। এর ফলে মদীনার চারপাশের ইহুদী গোষ্ঠী এবং কাফির সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল।"
ওয়াকিদি রহ. বলেন, "সকালে ইহুদীরা মুশরিকদের সাথে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে এসে বলল, আমাদের মধ্যে একজন শীর্ষ সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী এবং নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে গত রাতে হত্যা করা হয়েছে।"
তারা বলল, তাকে গুপ্তহত্যা করা হয়েছে। এর মানে হচ্ছে এই ব্যক্তি খুন হয়েছে এবং তা হয়েছে আকস্মিকভাবে। সে এই ব্যাপারে জানত না। তাকে গোপনে তার অবগতির বাইরে হত্যা করা হয়েছে।
তারা বলল, "তাকে কোন অপবাদ ছাড়াই হত্যা করা হয়েছে।" কেন তাকে হত্যা করা হল, এটাই ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে প্রশ্ন।
কারণ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং ইহুদীদের মধ্যে একটি চুক্তি ছিল। সীরাতে এটি ভালোভাবেই উল্লেখ আছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদীনায় আসেন তখন তাঁর সাথে সকল ইহুদীদের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিলো। এখন কাব ইবনে আশরাফকে হত্যা করা হয়েছে, কেন? এটা কেন হল?
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কী বললেন?
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
إنه لو قر كما قر غيره ممن هو على مثل رأيه ما قتل. ولاكنه نال منا الأذى وهجانا بشعر ولم يفعل هذا أحد منكم إلا كان السيف
"সে যদি শান্ত হয়ে যেত সইে ব্যক্তিদের অনুরূপ যারা তার মতামত অনুসরণ করে অথবা একই মত পোষণ করে, তাহলে তাকে হত্যা করা হত না। কিন্তু সে আমাদের ক্ষতি করছে, তার কবিতা দিয়ে আমাদের মানহানি করেছে এবং তোমাদের মধ্যে যেই এই কাজটি করত আমরা তালোয়ার দিয়ে এর বোঝাপড়া করতাম।"
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন যে "কাব ইবনে আশরাফরে মতো আরো অনেকে আছে যারা অন্তরে এই বিশ্বাস ধারণ করে কিন্তু তাদেরকে সেজন্য হত্যা করা হয়নি।" তার অবিশ্বাসের জন্য তাকে হত্যা করা হয়নি, এই জন্য হত্যা করা হয়নি যে সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ঘৃনা করত, এই জন্যও না যে সে মুসলমিদের ঘৃনা করত।
না! এরকম অনকেইে আছে, যাদরে অন্তরে এই ব্যাধি আছে কন্তিু আমরা তাদরেকে ছেড়ে দিয়েছি। সে যদি শান্ত হয়ে যেত অন্যদের মত, যারা শান্ত হয়ে গিয়েছিল আমরা তাকে হত্যা করতাম না। কিন্তু সে আমাদের বিরুদ্ধে কথা বলেছে এবং তার কবিতা দ্বারা আমার মানহানি করছে।
এরপর তিনি ইহুদীদের কাছে বিষয়টি পরিস্কার করে দিলেন। তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে কোন ইহুদী বা মুশরিক যদি কথার মাধ্যম, কবিতা বা মিডিয়ার মাধ্যমে আমার মানহানি করার চেষ্টা করো, তাহলে আমরা তাকে এভাবেই দেখে নেবো। তোমাদের আর আমাদের মধ্যে তলোয়ার ব্যতীত আর কিছুই করার থাকবে না! সেখানে কোন সংলাপ হবে না, কোন ক্ষমা করা হবে না, কোন সহমর্মিতা থাকবে না, মীমাংসার কোন উদ্যোগ নেয়া হবে না। আমার আর তোমাদের মধ্যে তখন থাকবে শুধুই তলোয়ার। এরপর তিনি তাদেরকে ডেকে একটি দলীলের স্বাক্ষর করতে বললনে যেখানে তারা সবাই সম্মতি জানাল যে তারা তাঁর বিরুদ্ধে আর কোন কথা বলবে না।
ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, এই ঘটনাটি এ বিষয়ের একটি শক্তিশালী প্রমাণ যে, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে অবমাননাকারীদের হত্যা করার ব্যাপারে মুসলিমদেরকে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করা হবে। এমনকি যদি তারা মুসলিমদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে থাকে তবুও। এটা এতই কঠিন একটি বিষয় যে, মুসলিমদের সাথে যৌথ অঙ্গীকারভুক্ত কোনো অমুসলিম এটি করলেও তার বিরুদ্ধে একই কঠোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে।
ইবনে তাইমিয়্যাহ তার কিতাবে এই হুকুমের বিরুদ্ধে উম্মোচিত কিছু যুক্তি ও সংশয়েরও অপনোদন করেছেন। সেগুলোর জবাব দিয়েছেন। তিনি সেই যুক্তিগুলো খন্ডন করতে এই ঘটনাকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করেছেন।
কিছু লোক হাদীসের অর্থকে বিকৃত করতে চেয়েছে এবং বলেছে যে, কা'বকে হত্যা হয়েছে কারণ সে কাফিরদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য উৎসাহিত করছিল।
ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন, না! তাকে হত্যা করা হয়েছে তার কবিতার জন্য, যেটি তার মক্কায় যাওয়ার পূর্বে ছিল। তাই তার মক্কায় যাওয়া এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফিরদেরকে উৎসাহিত করার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই, স্পষ্টরূপে এই সিদ্ধান্তটি তার কবিতার জন্যই দেয়া হয়েছিল। তারপর তিনি বলেন,
কাব ইবনে আশরাফ যা করেছিল তার সবকিছুই ছিল আকর্ষণীয় কথার দ্বারা ইসলামের ক্ষতিসাধন। হত্যাকৃত কাফিরদের প্রতি তার শোক প্রকাশ এবং তাদের যুদ্ধ করতে উৎসাহিত করা, তার অভিশাপ, অপবাদ, ইসলামকে প্রকাশ্যে কটাক্ষ করা, ছোট করে দেখা এবং কাফিরদের ধর্মকে অগ্রাধিকার দেয়া - এসব কিছুই ছিল তার মুখ থেকে বের হওয়া কাব্যিক ছন্দের কারসাজি।
সে মুসলিমদের বিরুদ্ধে শারিরীক যুদ্ধে সম্পৃক্ত ছিলো না। জড়িতছিল মুখ নিসৃত সাহিত্য আর সাংস্কৃতিক যুদ্ধে। তার আক্রমণ ছিলো আকর্ষণীয় শব্দাবলীর মাধ্যমে। সে মাধুর্যপূর্ণ বাক্যবিন্যাসের দ্বারা রচিত কাব্য দিয়ে ইসলাম ও মুসলিমদের ক্ষতি করছিলো।
আর এটিই হচ্ছে একটি হুজ্জাহ - এটি একটি প্রমাণ তাদের বিরুদ্ধেও যারা এই প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং ইসলামের অবমাননা করবে। এটি পরিস্কার, যে ব্যক্তি কবিতা ও অপবাদ দিয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ক্ষতি করবে, তার রক্ত কোনভাবেই সুরক্ষিত নয়।

(২) রাসূল (স) এর সাহাবাদের নিয়ে ঠাট্টা করা:
বিদ্রুপকারী এ ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে ঠাট্টা করে, এবং সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করে। এবং তাদের কারো কারো ক্ষেত্রে নিন্দা করে। যে রাসুল (স) এর সাহাবীদের গালমন্দ করে সে কাফের। কেননা তাদের ব্যাপারে অপবাদ দেয়া আল্লাহ তায়ালা, তার রাসূল (স) এবং তার শরীয়তে ব্যাপারে অপবাদ দেয়ার মতই।
(৩) আল্লাহ তায়ালার মুমীন বান্দাদের নিয়ে ঠাট্টা করা। মুমীনদেরকে নিয়ে ঠাট্টা করে, একারণে যে তারা আল্লাহ পাকের বিধান এবং রাসূল (স) এর সুন্নতকে আকড়ে ধরেছে। যেমন: দাড়ি লম্বা রাখা, এবং টাখনুর উপর কাপড় পরিধান করে বলে তাদেরকে নিয়ে ঠাট্টা করা হয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ পাক বলেন-
ان الذین اجرموا کانوا من الذین امنوا یضحکون۔ واذ مروبهم یتغامزون
অর্থ: নিশ্চয় যারা পাপিষ্ঠ তারা ইমানদারকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করে। যখন তাদের পাশ অতিক্রম করে তারা তখন তাদের মুমীনদেরকে নিয়ে কটাক্ষ করে। (সূরা মুতাফ্ফিীন। আয়াত নং- ২৯-৩০)
সুতরাং কোনো মুসলমানকে তার ইসলাম নিয়ে ঠাট্টা করা কুফুরী, আর এই ঠাট্টা করাটা কখনো কোনো মুসলামন হতে আশা করা যায় না। এবং তার দ্বীনদারির কারণে তার সাথে শত্রুতা রাখা ও তার দ্বীন থেকে তাকে ফিরানো জন্য প্রলুব্ধ করাও এই পর্যায়ের অন্তর্ভূক্ত। সুতরাং এসব কুফুরি এবং আল্লাহ তায়ালার রাস্তায় বাধা প্রদানের শামিল।
(৪) সাধারণ মানুষ নিয়ে ঠাট্টা- বিদ্রুপ করা:-
اسهزاء এর আরেক প্রকার হল সাধারণ মানুষকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করা, চাই তারা মুমীন হোক বা ফাসেক হোক, তাদেরকে বিদ্রুপাতœক উপাধি দেওয়া, তাদেরকে দিয়ে হাসি-ঠাট্টা করা এবং তাদের কাজকর্ম ও বাহ্যিক আকৃতি, চরিত্র ইত্যাদি অনুকরণ করা এসবই استهزاء এর অন্তর্ভূক্ত।
কোরআন মাজীদের আল্লাহ পাক বলেছেন-
یا ایها الذین امنوا لا یسخر قوم من قوم۔
অর্থ: হে ঈমানদার! (তোমাদের) এক ব্যক্তি যাতে আরেক ব্যক্তিকে নিয়ে ঠাট্টা না করে” (সূরা হজুরাত, আয়াত নং- ১১)
নবী করিম (স) বলেছেন “তোমার ভায়ের কষ্টে আনন্দ প্রকাশ করনা হতে পারে আল্লাহ তায়ালা তাকে রহম করবেন এবং তোমাকে তাতে (সেই কষ্টে) লিপ্ত করবেন”
এই প্রকার ঠাট্টাতেও এক ধরনের কষ্ট, আঘাত রয়েছে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- والذین یوذون المؤمنین وا